এইমাএ পাওয়া

বাংলাদেশের মেয়েকে ভারতে বিক্রি করতে চায় নিজ পিতা!

মার্চ ২৩, ২০১৬

বিনিয়োগবার্তা প্রতিনিধি, বগুড়া: বগুড়া সদর উপজেলার ধাওয়াকোলা গ্রামের দুই সহোদর রাজ্য চন্দ্র এবং বাবুল চন্দ্র বসতবাড়ি বিক্রি করে ভারতে পালিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে না নিয়ে তিন কন্যাকে নিয়ে গেছে। তবে যাবার সময় তাদেরকে (মেয়েদের) ভারতে বিক্রি করে দেয়া হবে বলে স্ত্রীদের হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে আদরের সন্তানের জন্য এখন দিশেহারা দুই মা। তাঁদের অভিযোগ, দেশান্তরি হওয়ার তাঁদের স্বামীরা হুমকি দিয়ে গেছেন, তিন শিশুকে বিক্রি করে দেবেন তাঁরা। এই ঘটনা বগুড়ার সদর উপজেলার ধাওয়াকোলা গ্রামের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ধাওয়াকোলা গ্রামের দুই সহোদর রাজ্য চন্দ্র কর্মকার এবং বাবলু চন্দ্র কর্মকার বসতভিটা বিক্রি করে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশ ছেড়েছেন। সঙ্গে নিয়ে গেছেন বাবা কালিপদ কর্মকার এবং মা কাঞ্চি রানী কর্মকারকে। তাঁদের ছোট দুই ভাই অনেক আগেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। দেশ ছাড়লেও রাজ্য চন্দ্র স্ত্রী দীপালি রানী কর্মকার (২৮) এবং বাবলু চন্দ্র তাঁর স্ত্রী তপতি রানী কর্মকারকে (২২) কিছুই জানাননি। উল্টো কৌশলে রাজ্য চন্দ্র তাঁর দুই শিশুকন্যা রিংকি (৮) ও টুসু (৪) এবং বাবলু চন্দ্র তাঁর পাঁচ বছরের মেয়ে পিংকিকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। ওই তিন শিশু স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াশোনা করত।
যখন কথা হয় তখন দীপালি রানী জানালেন, ১০ বছর সংসার করার পর ছেলেসন্তান না হওয়ায় কোনো মানুষ স্ত্রীকে একা ফেলে পালিয়ে যেতে পারে, এটা ভাবা যায় না। দীপালি বললেন, আমার দুই মেয়ে তো কোন অপরাধ করেনি! তাদেরকে চুরি করে নিয়ে গেল কেন? সীমান্ত পারাপারের সময় স্বামী আমাকে ফোনে হুমকি দিয়ে গেছে, বাচ্চাদের ভারতে নিয়ে বেঁচে দেবে। আমি কিছু চাই না, বুকের ধনগুলোকে ফেরত চাই। মা দীপালির এমনই দাবি।
দীপালির জা তপতি রানীর বিয়ে হয়েছে নয় বছর আগে। জানালেন, যৌতুকের আটআনা সোনার গয়নার জন্য দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করেছেন। তপতি বলেন, ‘মা-বাবা হারা এতিম আমি। দাদারা দরজির কাজ করেন। কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। এ কারণে সব সহ্য করেছি। কিন্তু পাঁচ বছরের কোলের সন্তান চুরি করে নিয়ে গিয়ে আমার পৃথিবীটাই অন্ধকার করে দিয়েছে।’
ধাওয়াকোলা গ্রামে খোঁজ নিয়ে গেছে, বড় ভাই রাজ্য চন্দ্র মহাস্থান বন্দরে এত দিন কর্মকারের কাজ করতেন। ছোট ভাই একই স্থানে একটি হার্ডওয়্যারের দোকান দিয়েছিলেন। দুই ভাই মাঝেমধ্যেই ভারতে যেতেন। তাঁদের ছোট দুই ভাইও অনেক আগেই দেশ ছেড়েছেন। এক বছর আগেই রাজ্য ও বাবলু ভিটেমাটি বিক্রি করে দিয়ে ভাড়া বাড়িতে ওঠেন।
দীপালির বড় ভাই স্বপন কুমারের কাছ থেকে জানা গেল, টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলা সদরে বাড়ি তাঁদের। দীপালি সখীপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ২০০৫ সালে আড়াই লাখ টাকা যৌতুক, আসবাব, সোনার গয়না দিয়ে ধুমধাম করে দীপালির বিয়ে দেওয়া হয়। স্বপন অভিযোগ করেন, ছেলেসন্তান না হওয়ায় তাঁর জামাইবাবু বোনের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাতেন।
তপতি রানী কর্মকারের বাড়ি সিরাজগঞ্জের চান্দাইকোনায়। তিনি বলেন, ‘আমার দাদারা খুবই গরিব। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর কন্যাসন্তান হয়, ছেলে না হওয়ায় স্বামী-শাশুড়ি খোঁটা দিত। নানাভাবে নির্যাতন করত।’
দীপালি ও তপতি জানালেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁদের তিন মেয়ে স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। পাশের গ্রামে লীলাকীর্তন শোনার কথা বলে তিন নাতনিকে নিয়ে প্রথমে বাড়ি থেকে বের হন শ্বশুর-শাশুড়ি। এক দিন পর দোকানে জরুরি কাজের কথা বলে বাড়ি ছাড়েন রাজ্য চন্দ্র ও বাবলু চন্দ্র। এর পরেই তাঁদের দেশত্যাগের বিষয়টি জানাজানি হয়।
এ ঘটনায় দীপালি রানী বাদী হয়ে ১ মার্চ বগুড়ার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে স্বামী-শ্বশুর-দেবরসহ আটজনের বিরুদ্ধে প্রতারণা এবং যৌতুক ও নারী নির্যাতন দমনের ধারায় মামলা করেছেন। বিচারক মো. কামরুজ্জামান অভিযোগ আমলে নিয়ে তা তদন্ত করে আগামী ২৯ মের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সদর উপজেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
একই দিন দুই নারী সন্তান ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে বগুড়ার পুলিশের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি জানার পরপরই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সদর থানার পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বামীরা তাঁদের ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর কয়েকদিন দীপালি রানী কর্মকার ও তপতী রানী কর্মকার বগুড়া শহরে আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন। এখন তাঁরা দুজন যার যার বাবার বাড়িতে থাকছেন। মেয়ে সন্তানদের ফিরে পাবেন এই আশায় আছেন তারা।