এইমাএ পাওয়া

প্রায় পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক ‘খেরুয়া মসজিদ’

এপ্রিল ২৫, ২০১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগ বার্তা:

বগুড়ার শেরপুর উপজেলা সদর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্রামীণ সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে খন্দকারটোলা গ্রামে অবস্থিত প্রায় পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক খেরুয়া মসজিদ।

মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে এই মসজিদটি। মসজিদটির নির্মাণ শৈলী আজও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের হৃদয় মনে ভীষণভাবে সাড়া দেয়। সীমানা প্রাচীর ঘেরা এ মসজিদটির ভেতরে প্রবেশদ্বারের সামনেই রয়েছে প্রতিষ্ঠাতার কবর।

মসজিদের সামনের দেয়ালে স্থাপিত ফারসি শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘শেরপুরের ইতিহাস’ বইয়ের লেখক ইতিহাসবিদ প্রাক্তন অধ্যক্ষ মুহাম্মদ রোস্তম আলী জানান, মির্জা নবাব মুরাদ খানের পৃষ্টপোষকতায় আব্দুস সামাদ ফকির ৯৮৯ হিজরির ২৬ জিলকদ (১৫৮২খ্রি.) সোমবার ওই স্থানে মসজিদটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

উত্তর-দক্ষিণ লম্বা বিশিষ্ট মসজিদটির বাইরের দিকের দৈর্ঘ্য ৫৭ ফুট এবং প্রস্থ ২৪ফুট। ভেতরের দিকের দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট ও প্রস্থ ১২ ফুট।

আর মসজিদের চারিদিকের দেয়ালের পুরুত্ব ৬ ফুট। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের চারকোনায় ৪টি মিনার ও পূর্ব দেয়ালে ৩টিসহ উত্তর-দক্ষিণে আরও ২টি দরজা রয়েছে। এছাড়া মসজিদের ৩টি মেহরাব আয়তকার ফ্রেমের মধ্যে অধ্যগোলকার করে স্থাপিত। মসজিদের কার্ণিস বাঁকানো। দেয়ালে কিছু কিছু পোড়া মাটির চিত্রফলকও ছিল। তবে সংখ্যায় খুবই কম।

এ মসজিদ নির্মাণে ইট, চুন ও শুরকি ছাড়াও বৃহদাকার কৃষ্ণ পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের সামনের দেয়ালে দু’টি শিলালিপি ছিল। এর একটি শিলালিপির ভেতরে বহু মূলবান সম্পদ রক্ষিত ছিল যা পরবর্তীতে ব্যবহৃত হয়। আর অপরটি বর্তমানে পাকিস্তানের করাচি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

সম্রাট আকবরের আমলে মসজিদটি নির্মিত হওয়ায় এর দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ব্যতিক্রম অনেক চিহ্ন দেখা যায়। স্থাপত্য বিশারদদের মতে খেরুয়া মসজিদে সুলতানী ও মোঘল আমলের মধ্যবর্তী স্থাপত্য নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছে। এতে বার ও আট কোনা কলাম ব্যবহার করা হয়েছে। যা বাঙলা স্থাপত্য শিল্পে বিরল।

মসজিদটিতে মুঘল পূর্ব যুগের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেলেও ভূমি পরিকল্পনায় মুঘল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। দেয়ালের সামনের দিকে মসজিদ থেকে পাওয়া শিলালিপিটি বসানো আছে। শিলালিপিটি পাথরের তৈরি।

দেয়াল গাত্রের শিলালিপি অনুযায়ী ৯৮৯ হিজরী/১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে জনৈক মির্জা মুরাদ খান কাকশাল কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত। মসজিদের সামনে খোলা চত্বরে সবুজ ঘাস কার্পেটের মত বিছানো। তাছাড়া আশেপাশে কিছু অন্যান্য বৃক্ষ মসজিদের সৌন্দর্য অনেকখানি বৃদ্ধি করেছে। মসজিদ চত্বর অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মসজিদে একজন কেয়ারটেকার আছেন। যিনি সার্বক্ষণিক সেখানে থাকেন। তার সাথে কথা বলে মসজিদের ভিতরেও যেতে পারবেন। এই মসজিদটিতে এখনও নামাজ পড়া হয়। সকালে মক্তবে আরবি শিক্ষা দেয়া হয়।

এ মসজিদটি দীর্ঘ সময় অবহেলায় পড়ে থাকে। তবে ৯০’র দশকে দেশের প্রত্নতত্ত বিভাগ মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ও আগের অবস্থায় ফিরে আনে। পরে ১৯৮৮ সাল থেকে প্রত্নতত্ত বিভাগ মসজিদটিসহ এর সম্পত্তি দেখভালের জন্য একজন খাদেম নিয়োগ দেয়।

খাদেম আব্দুস সামাদ জানান, ইতিহাস সমৃদ্ধ এ মসজিদটি পরিদর্শনে প্রতিনিয়ত দেশ বিদেশের বহু পর্যটক ও দর্শনার্থীসহ স্থাপত্য বিশারদরা আসেন। তবে মাত্র কয়েকশ গজ কাঁচা সড়ক ঐতিহাসিক এ মসজিদটিকে কিছুটা দুর্গম করে রেখেছে।

যাতায়াত: সড়ক পথে বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে বগুড়া যেতে পারেন। বগুড়ায় নামার পর বগুড়ার সাতমাথা থেকে বাস অথবা সিএনজিতে যেতে পারেন। বগুড়া শহর থেকে সিএনজি চালিত অটোরিক্সায় ঘন্টাখানেকের মধ্যে ধনুট মোড়ে পৌছানো যায়। সিএনজিতে ভ্রমন বাসের থেকে আরামদায়ক হবে। ভাড়া বাসে ধনুট মোড় পর্যন্ত ১৫ টাকা এবং সিএনজিতে ২৫টাকা ।

থাকা খাওয়া: শেরপুরে রাতযাপনের মতো ভাল কোনো হোটেল নেই। থাকার জন্য বেছে নিন বগুড়া শহরের হোটেল গুলো। সব ধরনের ও মানের থাকা-খাওয়ার জায়গা পাবেন এখানে। ২০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় রাতযাপনের ভাল ব্যবস্থা হয়ে যাবে। উল্লেখ যোগ্য কিছু হোটেল হল থ্রি স্টার হোটেল নাজ গার্ডেন, পর্যটন মোটেল, আকবরিয়া, সিয়াস্তা কিংবা হোটেল সেফওয়ে। এছাড়াও আরো অনেক হোটেল পাবেন। খাবারের ব্যবস্থা আছে সবগুলিতেই।

বিনিয়োগ বার্তা/এমআর