এইমাএ পাওয়া

উৎপাদন বন্ধ রেখেই ৪৩ কোটি টাকা তুলল নূরানী ডায়িং!

মে ২৩, ২০১৭

বিশেষ প্রতিবেদক,বিনিয়োগ বার্তা:
কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ প্রায় ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে। কোম্পানি সংশ্লিষ্ট কারো মতে তা প্রায় এক বছর। এর মধ্যেই পুঁজিবাজার থেকে ৪৩ কোটি টাকা তুলে নিল নূরানী ডায়িং অ্যান্ড সোয়েটার। এ প্রেক্ষাপটে কোম্পানির ভবিষ্যত ও লগ্নিকৃত টাকা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

ফেনী শহরতলীতে অবস্থিত নূরানী ডায়িং অ্যান্ড সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, সোয়েটার ইউনিটের মেশিনগুলো চলছে না। নেই কোনো শ্রমিক। তবে কিছু শ্রমিক কাজ করছে ডায়িং ইউনিটের একটি মাত্র বয়লার বিভাগে। শ্রমিক ও কর্মকর্তা মিলিয়ে সেখানে কর্মরত মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন লোক।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কোম্পানির সোয়েটার ইউনিট প্রায় ছয় মাস ধরে বন্ধ। এছাড়া কাজ না থাকায় ডায়িং ইউনিট চলছে না। তবে একটিমাত্র বয়লার চলছে। এতে কিছু শ্রমিক কর্মরত।

সেখানে কর্মরত শ্রমিক আলমগীর বলেন, ফ্যাক্টরিতে কাজ কম। তাই আসা যাওয়া করি। বেতনও নিয়মিত হয় না।

কারখানার ব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম জানান, এলসি হয় না, অর্ডার নেই, তাই কাজ নেই। সোয়েটার কারখানা চলতি বছরের শুরু থেকে বন্ধ রয়েছে। এর চাইতে বেশি কিছু বলতে পারব না, এসব বিষয়ে মালিকের সঙ্গে কথা বলুন।

সোয়েটার কারখানায় কাজ করতেন এমন একজন শ্রমিক বর্তমানে ফতেহপুরের কারখানার পাশে একটি দোকানে কাজ করেন। তার নাম মাইনুদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, শ্রমিকদের বেতন ঠিকমতো না দেওয়ার কারণে আন্দোলন করে তারা। এক পর্যায়ে মালিক কারাখানা বন্ধ করে দেয়। প্রায় এক বছর ধরে সোয়েটার কারখানা বন্ধ বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় নূরানী ডায়িং অ্যান্ড সোয়েটারের মালিক নূর আলম শিল্পপতি বনে যান। তার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন।তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন কোল্ড স্টোরেজের দায়িত্বে রয়েছেন।অন্য এক ভাই চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বাড়িতে বসবাস করেন।

পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনকারী নূরানী ডায়িং একটি পারিবারিক কোম্পানির মতোই। চার পরিচালকের মধ্যে শেখ নূরুল আলম ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তার স্ত্রী রেহানা আলম চেয়ারম্যান এবং তাদের ছেলে শেখ নূর মোহাম্মদ আজগর পরিচালক। অপর পরিচালক বিবি হাজেরা তাদের আত্মীয় বলে জানা গেছে।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কোম্পানিতে কোনো শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড নেই। তাছাড়া বীমাও নেই বলে জানান তারা।

কোম্পানির পরিচালক শেখ নূর মোহাম্মদ আজগর এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে রিপোর্ট করার দরকার নাই। আপনি আমাদের কোম্পানি সচিব মাহবুব আলম দিপুর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তিনি আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।

কোম্পানি সচিব মাহবুব আলম দিপু’র সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, কোম্পানিতে অ্যাকর্ডের কাজ চলছে তাই উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে কেন উৎপাদন বন্ধ সে ব্যাপারে কোনো জবাব দেননি তিনি।

কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেয় ইস্যু ম্যানেজার। উৎপাদন বন্ধ থাকা এমন একটি কোম্পানির কাগজপত্রে কীভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হলো এবং কীভাবে কোম্পানি পুঁজি সংগ্রহের সুযোগ পেল তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা।

কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা করিম আহমেদ জানান, প্রতিষ্ঠানটির প্রডাকশন বন্ধ থাকলে অর্থ উঠালে সে বিষয়টি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা(বিএসইসি) দেখবে।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা বিষয়টা তদন্ত করব, আর বিএসইসি সরেজমিন তদন্ত করে কোম্পানিকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দেয় না।

জানা গেছে, পুঁজিবাজারে শেয়ার লেনদেন শুরুর অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় আছে নূরানী ডায়িং।

কয়েকজন বিনিয়োগকারী নূরানী ডায়িংয়ের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিকে সাধারণত পুঁজিবাজারের মূল মার্কেট থেকে তালিকাচ্যুত করে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে পাঠানো হয়। অথচ সবার অগোচরে উৎপাদন বন্ধ নূরানী ডায়িং বাজার থেকে ৪৩ কোটি টাকা উঠিয়ে নিল। উৎপাদন বন্ধ এমন একটি কোম্পানিকে বাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের অনুমতি দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভালো কাজ করেনি। এটা সাধারণ মানুষের টাকা লোপাট করার প্রক্রিয়া ছাড়া কিছুই না।

বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এমন অনেক কোম্পানিকে বাজারে আসার অনুমোদন দেওয়ার কারণেই তো পুঁজিবাজার স্টাবল হয় না। বাজার স্টাবল করতে হলে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকে অনুমোদন দিতে হবে। উৎপাদন বন্ধ থাকার পরও উৎপাদনে আছে এমন তথ্য দিয়ে থাকলে নূরানী ডায়িংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বিএসইসির।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ৫৯৭তম কমিশন সভায় নূরানী ডায়িংয়ের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন দেয়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে শেয়ার ছেড়ে কোম্পানিটি বাজার থেকে ৪৩ কোটি টাকা উত্তোলন করে। উত্তোলিত অর্থ দিয়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে খাতে খরচ করবে।